বনী ইসরাঈলের মধ্যে এক বুযুর্গ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি অত্যন্ত সৎ ও আবেদ লোক ছিলেন। তাঁর সততা ও ইবাদতের আলোচনা দূর দূরান্ত পর্যন্ত হত। তিনি ছিলেন অত্যন্ত আল্লাহ ভীরু ও পরহেযগার লোক।
যখনই কোন জটিল মাসআলা সামনে আসতো তখনই মানুষ তাঁর খেদমতে হাযির হত এবং তাঁর নিকট হতে পরামর্শ গ্রহণ করত। বিপদ-আপদের সময় তাঁর মাধ্যমে দু’আও করিয়ে নিত।
যখন বনী ইসরাঈলের বুযুর্গদের আলোচনা আসে তখন জুরায়েযের নাম প্রতীয়মান হয়ে থাকে। নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও স্বীয় ঘোষণাসমূহের দৃষ্টান্ত স্বরূপ অতীতের যেসব বুযুর্গ ব্যক্তির আলোচনা করেছেন তাঁদের তালিকার সূচনায় জুরায়েযের ঘটনা রয়েছে; কিন্তু জুরায়েযের ন্যায় বুযুর্গ ব্যক্তিত্ব হতেও যখন মাতার সামনে একটা অতি সাধারণ অবাধ্য আচরণ হয়ে যায় তখন তাঁকেও এই দুনিয়াতেই এর পরিণাম বা ফল ভোগ করতে হয়। তাঁর উপর তাঁর মায়ের বদ দু’আ লেগে যায় এবং তিনি পরীক্ষার মধ্যে পড়ে যান। তাঁর এই ঘটনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম ছাড়াও হাদীসের কয়েকটি কিতাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে। আসুন, আমরা আপনাদের খেদমতে জুরায়েযের এই ঘটনাটি পেশ করছি। এর মাধ্যমে পিতা মাতার মর্যাদা কত বড় তা আপনারা অনুমান করতে পারবেন।
জুরায়েযের এই ঘটনাটির বর্ণনাকারী হচ্ছেন আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু)। ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণে নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
“শুধুমাত্র তিনটি দুগ্ধ পোষ্য শিশু এমন রয়েছে যারা মাতার কোলে কথাবার্তা বলেছে। এই তিন জনের মধ্যে একজন তো হলেন ঈসা বিন মারইয়াম (আলাইহিস সালাম)। যখন তাঁর মাতা মারইয়াম (আলাইহিস সালাম) তাঁকে জন্ম দেন, তখন জনগণ তাঁর উপর অপবাদ দেয়, এটা অবৈধ সন্তান! কেননা, মারইয়ামের বিয়ে হয়নি। তখন আল্লাহ তায়ালা তাঁর শিশু অর্থাৎ ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর যবান খুলে দেন এবং তাঁর দ্বারা জনগণের সামনে এই সাক্ষ্য প্রদান করান যে, এটা মহা মহিমান্বিত আল্লাহরই মহা শক্তির ফল। তিনি পিতা ছাড়াই এ শিশুর জন্ম দিয়েছেন। যেমন তিনি আদম (আলাইহিস সালাম) কে মাতা পিতা ছাড়াই সৃষ্টি করেছিলেন। দ্বিতীয় শিশু হচ্ছে ঐ শিশু যে বনী ইসরাঈলের বুযুর্গ অর্থাৎ জুরায়েযকে নিষ্পাপ সাব্যস্তকারী রূপে মুখ খুলেছিল এবং জনগণের সামনে তাঁর পবিত্রতার সাক্ষ্য দান করেছিল।
জুরায়েযের ঘটনাটি এই যে, তিনি একজন বড় আবেদ লোক ছিলেন। রাত-দিন তিনি আল্লাহ তায়ালার ইবাদতেই লেগে থাকতেন। ইবাদতের উদ্দেশ্যে তিনি একটি ঘর বানিয়ে ছিলেন। তিনি সেখানেই থাকতেন এবং আল্লাহ তায়ালার ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন। তিনি ইবাদত ও আধ্যাত্মিক সাধনায় এমনই মগ্ন থাকতেন যে, তাঁর পার্থিব কাজ কারবারের কোন চিন্তাই থাকত না। তিনি দুনিয়ার ব্যাপারে কখনও কোন চিন্তাই করতেন না। শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালাকে খুশী রাখার জন্যেই তিনি দিন-রাত তাঁর ইবাদতে লেগে থাকতেন।
একবার তাঁর মা তাঁর কাছে আসেন। এই সময় ছিল তাঁর ইবাদতের সময়। তিনি যথা নিয়মে ইবাদতে নিমগ্ন ছিলেন। মাতা ইবাদত খানার দরজায় দাঁড়িয়ে স্বীয় পুত্র জুরায়েযকে ডাক দেন। জুরায়েয যখন মাতার ডাক শুনতে পান তখন ইবাদতের মধ্যেই তাঁর অন্তরে এ ধারণা আসে যে, এখন তিনি কি করবেন! তাই তিনি মহান আল্লাহকে সম্বোধন করে বলেন:
“হে আল্লাহ! আমি এখন আপনার ইবাদতে লিপ্ত রয়েছি। আপনার বন্দেগী করছি। আপনাকে খুশী করার চেষ্টা করছি। আর এদিকে আমার মাতা আমাকে ডাকতে এসেছেন। আমি এখন কি করব? এই সংকটময় মুহূর্তে আমার কি করা উচিত? আমাকে কি ইবাদতেই লেগে থাকতে হবে, না কি মাতার ডাকে সাড়া দিতে হবে?”
যাই হোক, শেষ পর্যন্ত তিনি ইবাদতেই লেগে থাকলেন এবং মাতার ডাকে সাড়া দিলেন না। তাঁর মাতা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন; কিন্তু পুত্রের পক্ষ থেকে কোন সাড়া না পেয়ে ফিরে গেলেন।
পরের দিনও জুরায়েযের মাতা ইবাদত খানায় আসলেন। এ সময়েও জুরায়েয আল্লাহ তায়ালার ইবদতে মগ্ন ছিলেন। মাতা তাঁর নাম ধরে ডাক দিলেন। মাতার ডাকার শব্দ যখন তাঁর কানে প্রবেশ করে তখন তিনি মনে মনে বলেন:
“হে আল্লাহ! হে জগতসমূহের প্রতিপালক! আমি আপনার ইবাদতে মশগূল রয়েছি। আর এদিকে আমার মাতা আমাকে ডাকছেন। আমি এখন কি করব বুঝতে পারছিনা। ইবাদত ছেড়ে দিয়ে কি মাতার ডাকে সাড়া দিব, না কি ইবাদত পূর্ণ করব?
শেষ পর্যন্ত তিনি ইবাদতেই মশগূল থাকলেন। মাতা তার ডাকে কোন সাড়া না পেয়ে ফিরে গেলেন; কিন্তু এবার তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে পুত্রকে বদ দু’আ দিয়ে দিলেন।
তিনি বললেন:
«اللَّهُمَّ لَا تُمِتَهُ حَتَّى يَنْظُرَ إِلَى وُجُوهِ المُومِسَاتِ
অর্থাৎ “হে আল্লাহ! তাকে ঐ পর্যন্ত মৃত্যুদান করবেন না যে পর্যন্ত না কোন অসতী নারীর মুখ দেখে নেয়!”
নি:সন্দেহে জুরায়েয বনী ইসরাঈলের একজন মনোনীত ও আল্লাহ ভীরু ব্যক্তি ছিলেন; কিন্তু মাতার বদদু’আর পর তাঁর পরিবেশ বদলিয়ে যায়। মানুষ তাঁর সম্পর্কে পরস্পর কথা বলাবলি করত এবং তাঁর ইবাদতের আলোচনা করত। কতিপয় লোকের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে হিংসা ও সৃষ্টি হয়ে যায়। সুতরাং তারা জুরায়েযকে লাঞ্ছিত ও অপদস্ত করার চেষ্টা করতে শুরু করে। একবার ঐ লোকদের নিকট একটি স্ত্রী লোক আসলো। সে তাদের সংকল্প শুনে তাদেরকে বলতে লাগল:
“আমার পক্ষে জুরায়েযকে পথভ্রষ্ট করা এবং তাকে আমার সৌন্দর্যের ফাঁদে ফেলা কোন কঠিন ব্যাপারই নয়। তোমরা যদি আমাকে অনুমতি দাও তবে আমি জুৱায়েমের ব্যক্তিত্বকে জখমী করে দিতে পারি এবং আমার প্রতি তাকে আসক্ত করতে সক্ষম। এভাবে জুরায়েখকে লাঞ্ছিত করার সুযোগ তোমাদের হয়ে যাবে এবং জনগণের মধ্যে তার বদনাম হবে।”
এই মহিলাটি অত্যন্ত সুন্দরী ছিল বটে; কিন্তু তার চরিত্র ছিল অত্যন্ত ঘৃণ্য। সব লোকেরই তার কথার যথার্থতা জানা ছিল। তার নিজের সৌন্দর্যের উপর এত গর্ব ছিল যে, সে যাকেই চাইত তাকেই নিজের আকর্ষণে টেনে নিত। এ কারণে সে জুরায়েযের হিংসুকদের সামনে ওয়াদা করল যে, সে কোন না উপায়ে জুরায়েযকে তার সৌন্দর্যের ফাঁদে জড়িয়ে ফেলবে। সতুরাং ঐ অসতী নারী জুরায়েযের ইবাদত খানার নিকট আসলো এবং তাঁকে স্বীয় অঙ্গ ভঙ্গীর মাধ্যমে জড়িয়ে ফেলতে চাইল; কিন্তু জুরায়ের প্রকৃতপক্ষেই একজন সৎ লোক ছিলেন। তাঁর মধ্যে সদা সর্বদা আল্লাহ তায়ালার ভয় বিরাজ করত। এ কারণে তিনি দিন-রাত ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। সুতরাং কি করে তিনি ঐ অসতী নারীর কাঁদে জড়িয়ে পড়তে পারেন? ঐ অসতী মহিলা জুরায়েযকে নানা প্রকারের প্রতারণা করতে চাইল এবং নিজের দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করল; কিন্তু হাজার চেষ্টা করা সত্বেও সে স্বীয় চেষ্টায় সফলতা লাভ করতে পারল না।
যখন ঐ অসতী নারী দেখল যে, কোনক্রমেই সে জুরায়েযকে নিজের অধিকারে আনতে পারল না তখন সে ভীষণ রাগে ফেটে পড়ল। সে কঠিনভাবে অপমানিত বোধ করল। কেননা, জুরায়েযের পবিত্র চরিত্রের ফলে তার আশায় বড় রকমের ধাক্কা লেগেছে। এমন আল্লাহ ওয়ালার সাথে তার পালা পড়েছিল যিনি রাতের নির্জনতার মধ্যেও যখন কেউই তাঁকে দেখতে পেত না তখনও তিনি মহান আল্লাহকে ভয় করছেন! তাঁর বিশ্বাস ছিল যে, মানুষের চক্ষুর আড়ালে থাকা যেতে পারে; কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হতে কোন গোপন তথ্য গোপন রাখা যেতে পারে না! তিনি অন্তরের গোপন কথাও জানেন। এখন ঐ দুষ্ট মহিলা অন্য এক পন্থা অবলম্বন করল। সে এক রাখালের নিকট গেল। রাখালটি জুরায়েযের ইবাদত খানার আশে পাশেই ছাগল চরাত। মহিলাটি ঐ রাখলকে ফাঁদে ফেলে দিল এবং তার সাথে ব্যভিচার করে আসল। যখন শিশু ভূমিষ্ট হলো তখন সে লোকদেরকে বলতে লাগল যে, এটা জুরায়েযের সন্তান।
জনগণ ঐ চরিত্রহীনা মহিলাটির কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। তৎক্ষণাৎ তারা জুরায়েযের ইবাদতখানার নিকটে পৌঁছে তোলপাড় শুরু করে দিল। যখন তারা জুরায়েযকে প্রহার করতে শুরু করলো, তখন তিনি তাদেরকে বললেন:
“ভাইসব! আমাকে বলুন তো যে, আপনারা আমাকে প্রহার করছেন কেন? আমি আপনাদের কি ক্ষতি করেছি!”
জনগণ উত্তর দিল: “তুমি ঐ অসতী মহিলার সাথে ব্যভিচার করেছিলে এবং এর ফলে তোমার সন্তান হয়েছে।”
তাদের একথা শুনে জুরায়ে বললেন: “আমি কখনই ব্যভিচার করিনি! এটা আমার উপর একটা অপবাদ মাত্র। সম্পূর্ণরূপে এটা মিথ্যা কথা। জেনে শুনে আমাকে এই ঘৃণ্য কাজে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে!”
কিন্তু তাঁর পক্ষ থেকে লাখো সাফাই ও দুহাই দেয়া সত্বেও তারা তাঁকে নির্দোষ বলে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। তারা তাঁর ইবাদত খানাটিকে ভেঙ্গে ফেলল এবং তাঁকে মারপিট করতেই থাকলো।
যখন জুরায়ে দেখলেন যে, জনগণ কোন মূল্যেই তাঁর পবিত্রতা মেনে নিতে প্রস্তুত নয় তখন তিনি তাদেরকে বললেন: “তোমরা শিশুটিকে আমার নিকট নিয়ে এসো। সেই আমার নির্দোষিতা প্রমাণ করবে।” শিশুটিকে তাঁর নিকট আনা হলে তিনি জনগণকে বললেন:
«دَعُونِي حَتَّى أُصَلي
অর্থাৎ “তোমরা আমাকে নামায পড়ে নিতে দাও।”
সুতরাং তিনি নামায পড়লেন। নামায শেষে তিনি শিশুটির নিকট আসলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন:
«يَا غُلَامٌ مَنْ أَبُوكَ؟»
অর্থাৎ “হে শিশু! তোমার পিতা কে?”
শিশুটি উত্তর দিল: “অমুক রাখাল আমার পিতা।”
জনগণ যখন দেখল যে, দুগ্ধ পোষ্য শিশু জুরায়েযের নির্দোষিতা ও পবিত্রতার সাক্ষ্য দিয়ে দিল তখন তাদের দৃষ্টিতে জুরায়েযের গুরুত্ব ও মর্যাদা পূর্বাপেক্ষা বহুগুণে বেড়ে গেল। তারা তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে শুরু করল এবং তাঁর হাতদ্বয় চুম্বন করল। অতঃপর তারা তাকে বলল:
انَيْنِي لَكَ صَوْمَعَتَكَ مِنْ ذَهَبٍ
অর্থাৎ “আমরা আপনার ইবাদতখানাটি স্বর্ণ দ্বারা নির্মাণ করে দেই।”
তিনি উত্তরে বললেন:
لا ، أَعِيدُوهَا مِنْ طِينٍ كَمَا كَانَتْ
অর্থাৎ “না, না। আমার ইবাদত খানাটি স্বর্ণ দ্বারা নির্মাণ করার কোনই প্রয়োজন নেই; বরং পূর্বে যেমন মাটি দ্বারা নির্মিত ছিল তদ্রূপই বানিয়ে দাও।”
সুতরাং জনগণ জুরায়েযের জন্যে পূর্বের মতই ইবাদতখানা নির্মাণ করে দেয়।
মাতার গুরুত্ব কত বেশি! তাঁর সাধারণ বদ দু’আর কারণে তাঁকে কত বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। এই ঘটনার মাধ্যমে বোঝা যায় যে, মাতার আনুগত্য নফল ইবাদতের উপর অগ্রগণ্য। অনুরূপভাবে বিভিন্ন রেওয়ায়েতের উপর ভিত্তি করে উলামায়ে কিরাম ও ফুকাহায়ে ইসলাম এই মাসআলা গ্রহণ করেছেন যে, মাতার আদেশ মানা করা জিহাদের মত বিরাট কার্য হতেও বেশি গুরুত্ব রাখে। আর জিহাদের উপর মাতার হুকুম মানা করা অগ্রগণ্য। অনুরূপভাবে হিজরতের উপর মাতা পিতার হুকুম মানা করা অগ্রগণ্য। এরূপ অবস্থায় আমাদের নিজেদের মাতা পিতার কত বেশি খেদমত করা আমাদের উচিত? এটা আপনারা নিজেরাই অনুমান করে। নিন।
১। সহীহ আল-বুখারী: ৩৪৩৬, সহীহ মুসলিম: ২৫৫০
